Wednesday, 11 May 2016

জ্ঞানীর মতে অসংখ্য অবতার -- কুটীচক -- তীর্থ কেন


ঠাকুর অনন্ত ও অনন্ত ঈশ্বর -- সকলই পন্থা -- শ্রীবৃন্দাবন-দর্শন

[জ্ঞানীর মতে অসংখ্য অবতার -- কুটীচক -- তীর্থ কেন]

শ্রীরামকৃষ্ণ -- জ্ঞানীরা নিরাকার চিন্তা করে। তারা অবতার মানে না। অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে স্তব করছেন, তুমি পূর্ণব্রহ্ম; কৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, আমি পূর্ণব্রহ্ম কি না দেখবে এস। এই বলে একটা জায়গায় নিয়ে গিয়ে বললেন, তুমি কি দেখছ? অর্জুন বললে, আমি এক বৃহৎ গাছ দেখছি, -- তাতে থোলো থোলো কালো জামের মতো ফল ফলে রয়েছে। কৃষ্ণ বললেন, আরও কাছে এস দেখ দেখি ও থোলো থোলো ফল নয় -- থোলো থোলো কৃষ্ণ অসংখ্য ফলে রয়েছে -- আমার মতো। অর্থাৎ সেই পূর্ণব্রহ্মরূপ থেকে অসংখ্য অবতার হচ্ছে যাচ্ছে।

“কবীর দাসের নিরাকারের উপর খুব ঝোঁক ছিল। কৃষ্ণের কথায় কবীর দাস বলত, ওঁকে কি ভজব? -- গোপীরা হাততালি দিত আর উনি বানর নাচ নাচতেন! (সহাস্যে) আমি সাকারবাদীর কাছে সাকার, আবার নিরাকারবাদীর কাছে নিরাকার।”

মণি (সহাস্যে) -- যাঁর কথা হচ্ছে তিনিও (ঈশ্বর) যেমন অনন্ত, আপনিও তেমনি অনন্ত! -- আপনার অন্ত পাওয়া যায় না।

শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) -- তুমি বুঝে ফেলেছ! -- কি জানো -- সব ধর্ম একবার করে নিতে হয়। -- সব পথ দিয়ে চলে আসতে হয়। খেলার ঘুঁটি সব ঘর না পার হলে কি চিকে উঠে? -- ঘুঁটি যখন চিকে উঠে কেউ তাকে ধরতে পারে না।

মণি -- আজ্ঞা হাঁ।

শ্রীরামকৃষ্ণ -- যোগী দুই প্রকার, -- বহুদক আর কুটীচক। যে সাধু অনেক তীর্থ করে বেড়াচ্ছে -- যার মনে এখনও শান্তি হয় নাই, তাকে বহুদক বলে। যে-যোগী সব ঘুরে মন স্থির করেছে, যার শান্তি হয়ে গেছে -- সে এক জায়গায় আসন করে বসে -- আর নড়ে না। সেই এক স্থানে বসেই তার আনন্দ। তার তীর্থে যাওয়ার কোনও প্রয়োজন করে না যদি সে তীর্থে যায়, সে কেবল উদ্দীপনের জন্য।

“আমায় সব ধর্ম একবার করে নিতে হয়েছিল -- হিন্দু, মুসলমান, খ্রীষ্টান আবার শাক্ত, বৈষ্ণব, বেদান্ত -- এ-সব পথ দিয়েও আসতে হয়েছে। দেখলাম, সেই এক ঈশ্বর -- তাঁর কাছেই সকলি আসছে -- ভিন্ন ভিন্ন পথ দিয়ে।

“তীর্থে গেলাম তা এক-একবার ভারী কষ্ট হত। কাশীতে সেজোবাবুদের বৈঠকখানায় গিয়েছিলাম। সেখানে দেখি তারা বিষয়ের কথা কচ্ছে! -- টাকা, জমি, এই সব কথা। কথা শুনে আমি কাঁদতে লাগলাম। বললাম, মা, কোথায় আনলি! দক্ষিণেশ্বরে যে আমি বেশ ছিলাম। পইরাগে দেখলাম, সেই পুকুর, সেই দুর্বা, সেই গাছ, সেই তেতুঁল পাতা! কেবল তফাত পশ্চিমে লোকের ভুষির মতো বাহ্য। (ঠাকুর ও মণির হাস্য)

“তবে তীর্থে উদ্দীপন হয়ে বটে। মথুরবাবুর সঙ্গে বৃন্দাবনে গেলাম। মথুরবাবুর বাড়ির মেয়েরাও ছিল -- হৃদেও ছিল। কালীয়দমন ঘাট দেখবামাত্রই উদ্দীপন হত -- আমি বিহ্বল হয়ে যেতাম! -- হৃদে আমায় যমুনার সেই ঘাটে ছেলেটির মতন নাওয়াত।

“যমুনার তীরে সন্ধ্যার সময়ে বেড়াতে যেতাম। যমুনার চড়া দিয়ে সেই সময় গোষ্ঠ হতে গরু সব ফিরে আসত। দেখবামাত্র আমার কৃষ্ণের উদ্দীপন হল, উন্মত্তের ন্যায় আমি দৌড়তে লাগলাম -- ‘কৃষ্ণ কই, কৃষ্ণ কই’ এই বলতে বলতে!

“পালকি করে শ্যামকুণ্ড রা ধাকুণ্ডের পথে যাচ্ছি, গোবর্ধন দেখতে নামলাম, গোবর্ধন দেখবামাত্রই একেবারে বিহ্বল, দৌড়ে গিয়ে গোবর্ধনের উপরে দাঁড়িয়ে পড়লুম। -- আর বাহ্যশূন্য হয়ে গেলাম। তখন ব্রজবাসীরা গিয়ে আমায় নামিয়া আনে। শ্যামকুণ্ড রাধাকুণ্ড পথে সেই মাঠ, আর গাছপালা, পাখি, হরিণ -- এই সব দেখে বিহ্বল হয়ে গেলাম। চক্ষের জলে কাপড় ভিজে যেতে লাগল। মনে হতে লাগল, কৃষ্ণ রে, সবই রয়েছে, কেবল তোকে দেখতে পাচ্ছি না। পালকির ভিতরে বসে, কিন্তু একবার একটি কইবার শক্তি নাই -- চুপ করে বসে! হৃদে পালকির পিছনে আসছিল। বেয়ারাদের বলে দিল ‘খুব হুঁশিয়ার।’

“গঙ্গামায়ী বড় যত্ন করত। অনেক বয়স। নিধুবনের কাছে কুটিরে একলা থাকত। আমার অবস্থা আর ভাব দেখে, বলত -- ইনি সাক্ষাৎ রাধা দেহধারণ করে এসেছেন। আমায় ‘দুলালী’ বলে ডাকত! তাকে পেলে আমার খাওয়া-দাওয়া, বাসায় ফিরে যাওয়া সব ভুল হয়ে যেত। হৃদে এক-একদিন বাসা থেকে খাবার এনে খাইয়ে যেত -- সেও খাবার জিনিস তয়ের করে খাওয়াত।

“গঙ্গামায়ীর ভাব হত। তার ভাব দেখবার জন্য লোকের মেলা হত। ভাবেতে একদিন হৃদের কাঁধে চড়েছিল।

“গঙ্গামায়ীর কাছ থেকে দেশে চলে আসবার আমার ইচ্ছা ছিল না। সব ঠিক-ঠাক, আমি সিদ্ধ চালের ভাত খাব; -- গঙ্গামায়ীর বিছানা ঘরের এদিকে হবে, আমার বিছানা ওদিকে হবে। সব ঠিক-ঠাক। হৃদে তখন বললে, তোমার এত পেটের অসুখ -- কে দেখবে? গঙ্গামায়ী বললে, কেন, আমি দেখব, আমি সেবা করব। হৃদে একহাত ধরে টানে আর গঙ্গামায়ী একহাত ধরে টানে -- এমন সময় মাকে মনে পড়ল! -- মা সেই একলা দক্ষিণেশ্বরে কালীবাড়ির নবতে। আর থাকা হল না। তখন বললাম, না, আমায় যেতে হবে!

“বৃন্দাবনের বেশ ভাবটি। নতুন যাত্রী গেলে ব্রজ বালকেরা বলতে থাকে, ‘হরি বোলো, গাঁঠরী খোলো!’

বেলা এগারটার পর ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ মা-কালীর প্রসাদ গ্রহণ করিলেন। মধ্যাহ্নে একটু বিশ্রাম করিয়া বৈকালে আবার ভক্তদের সঙ্গে কথাবার্তায় কাটাইতেছেন -- কেবল মধ্যে মধ্যে এক-একবার প্রণবধ্বনি বা “হা চৈতন্য” এই নাম উচ্চারণ করিতেছেন।

ঠাকুরবাড়িতে সন্ধ্যার আরতি হইল। আজ বিজয়া, শ্রীরামকৃষ্ণ কালীঘরে আসিয়াছেন, মাকে প্রণামের পর ভক্তেরা তাঁহার পদধূলি গ্রহণ করিলেন। রামলাল মা-কালীর আরতি করিয়াছেন। ঠাকুর রামলালকে সম্বোধন করিয়া বলিতেছেন, “ও রামনেলো! কই রে!”

মা-কালীর কাছে সিদ্ধি নিবেদন করা হইয়াছে। ঠাকুর সেই প্রসাদ স্পর্শ করিবেন -- সেইজন্য রামলালকে ডাকিতেছেন। আর আর ভক্তদের সকলকে একটু দিতে বলিতেছেন।

Monday, 9 May 2016

এ সংসার কেন?



ত্রিভির্গুণয়ৈর্ভাবৈরেভিঃ সর্বমিদং জগৎ ৷
মোহিতং নাভিজানাতি মামেভ্যঃ পরমব্যয়ম্‌ ৷৷
                                                                                [গীতা -- ৭।১৩]
এ সংসার কেন?

শ্রীরামকৃষ্ণ (কেশবাদির প্রতি) -- বন্ধন আর মুক্তি -- দুয়ের কর্তাই তিনি। তাঁর মায়াতে সংসারী জীব কামিনী-কাঞ্চনে বদ্ধ, আবার তাঁর দয়া হলেই মুক্ত। তিনি “ভববন্ধনের বন্ধনহারিণী তারিণী”।

এই বলিয়া গন্ধর্বনিন্দিতকন্ঠে রামপ্রসাদের গান গাহিতেছেন:

শ্যামা মা উড়াচ্ছ ঘুড়ি (ভবসংসার বাজার মাঝে) ৷
(ওই যে) আশা-বায়ু ভরে উড়ে, বাঁধা তাহে মায়া দড়ি ৷৷
কাক গণ্ডি মণ্ডি গাঁথা, পঞ্জরাদি নানা নাড়ী ৷
ঘুড়ি স্বগুণে নির্মাণ করা, কারিগরি বাড়াবাড়ি ৷৷
বিষয়ে মেজেছ মাঞ্জা, কর্কশা হয়েছে দড়ি ৷
ঘুড়ি লক্ষের দুটা-একটা কাটে, হেসে দাও মা হাত-চাপড়ি ৷৷
প্রসাদ বলে, দক্ষিণা বাতাসে ঘুড়ি যাবে উড়ি ৷
ভবসংসার সমুদ্রপারে পড়বে গিয়ে তাড়াতাড়ি ৷৷

“তিনি লীলাময়ী! এ-সংসার তাঁর লীলা। তিনি ইচ্ছাময়ী, আনন্দময়ী। লক্ষের মধ্যে একজনকে মুক্তি দেন।”

ব্রাহ্মভক্ত -- মহাশয়, তিনি তো মনে করলে সকলকে মুক্ত করতে পারেন। কেন তবে আমাদের সংসারে বদ্ধ করে রেখেছেন?

শ্রীরামকৃষ্ণ -- তাঁর ইচ্ছা। তাঁর ইচ্ছা যে, তিনি এইসব নিয়ে খেলা করেন। বুড়ীকে আগে থাকতে ছুঁলে দৌড়াদৌড়ি করতে হয় না। সকলেই যদি ছুঁয়ে ফেলে, খেলা কেমন করে হয়? সকলেই ছুঁয়ে ফেললে বুড়ি অসন্তুষ্ট হয়। খেলা চললে বুড়ীর আহ্লাদ। তাই “লক্ষের দুটো-একটা কাটে, হেসে দাও মা হাত-চাপড়ি।” (সকলের আনন্দ)

“তিনি মনকে আঁখি ঠেরে ইশারা করে বলে দিয়েছেন, ‘যা, এখন সংসার করগে যা।’ মনের কি দোষ? তিনি যদি আবার দয়া করে মনকে ফিরিয়া দেন, তাহলে বিষয়বুদ্ধির হাত থেকে মুক্তি হয়। তখন আবার তাঁর পাদপদ্মে মন হয়।”

ঠাকুর সংসারীর ভাবে মার কাছে অভিমান করে গাইতেছেন:

        আমি ওই খেদ খেদ করি ৷
    তুমি মাতা থাকতে আমার জাগা ঘরে চুরি ৷৷
    মনে করি তোমার নাম করি, কিন্তু সময়ে পাসরি ৷
আমি বুঝেছি জেনেছি, আশয় পেয়েছি এ-সব তোমারি চাতুরী ৷৷
কিছু দিলে না, পেলে না, নিলে না, খেলে না, সে দোষ কি আমারি ৷
যদি দিতে পেতে, নিতে খেতে, দিতাম খাওয়াতাম তোমারি ৷৷
    যশ, অপজশ, সুরস, কুরস সকল রস তোমারি ৷
    (ওগো) রসে থেকে রসভঙ্গ, কেন কর রসেশ্বরী ৷৷
    প্রসাদ বলে, মন দিয়েছ, মনেরি আঁখি ঠারি ৷
(ওমা) তোমার সৃষ্টি দৃষ্টি-পোড়া, মিষ্টি বলে ঘুরি ৷৷

“তাঁরই মায়াতে ভুলে মানুষ সংসারী হয়েছে। ‘প্রসাদ বলে মন দিয়েছে, মনেরি আঁখি ঠারি’।”

[কর্মযোগ সম্বন্ধে শিক্ষা -- সংসার ও নিষ্কামকর্ম ]

ব্রাহ্মভক্ত -- মহাশয়, সব ত্যাগ না করলে ঈশ্বরকে পাওয়া যাবে না?

শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) -- নাগো! তোমাদের সব ত্যাগ করতে হবে কেন? তোমরা রসে-বসে বেশ আছ। সা-রে-মা-তে! (সকলের হাস্য) তোমরা বেশ আছ। নক্স খেলা জানো? আমি বেশি কাটিয়ে জ্বলে গেছি। তোমরা খুব সেয়ানা। কেউ দশে আছো; কেউ ছয়ে আছো; কেউ পাঁচে আছো। বেশি কাটাও নাই; তাই আমার মতো জ্বলে যাও নাই। খেলা চলছে -- এ তো বেশ। (সকলের হাস্য)

“সত্য বলছি, তোমরা সংসার করছ এতে দোষ নাই। তবে ঈশ্বরের দিকে মন রাখতে হবে। তা না হলে হবে না। একহাতে কর্ম কর, আর-একহাতে ঈশ্বরকে ধরে থাক। কর্ম শেষ হলে দুইহাতে ঈশ্বরকে ধরবে।

“মন নিয়ে কথা। মনেতেই বদ্ধ, মনেতেই মুক্ত। মন যে-রঙে ছোপাবে সেই রঙে ছুপবে। যেমন ধোপাঘরের কাপড়। লালে ছোপাও লাল, নীলে ছোপাও নীল, সবুজ রঙে ছোপাও সবুজ। যে-রঙে ছোপাও সেই রঙেই ছুপবে। দেখ না, যদি একটু ইংরেজী পড়, তো অমনি মুখে ইংরেজী কথা এসে পড়ে। ফুট-ফাট, ইট-মিট্‌। (সকলের হাস্য) আবার পায়ে বুটজুতা, শিস দিয়ে গান করা; এই সব এসে জুটবে। আবার যদি পণ্ডিত সংস্কৃত পড়ে অমনি শোলোক ঝাড়বে। মনকে যদি কুসঙ্গে রাখ তো সেরকম কথাবার্তা, চিন্তা হয়ে যাবে। যদি ভক্তের সঙ্গে রাখ, ঈশ্বরচিন্তা, হরি কথা -- এই সব হবে।

“মন নিয়েই সব। একপাশে পরিবার, একপাশে সন্তান। একজনকে একভাবে, সন্তানকে আর-একভাবে আদর করে। কিন্তু একই মন”৷

Sunday, 8 May 2016

Pictures

নিষ্কামকর্ম বা কর্মযোগ ও জগতের উপকার -- Sri Ramakrishna and the European ideal of work




“পূজা, হোম, যাগ” কিছুই কিছু নয়। যদি তাঁর উপর ভালবাসা আসে, তাহলে আর এ-সব কর্মের বেশি দরকার নাই। যতক্ষণ হাওয়া পাওয়া না যায়, ততক্ষণই পাখার দরকার; যদি দক্ষিণে হাওয়া আপনি আসে, পাখা রেখে দেওয়া যায়। আর পাখার কি দরকার?

“তুমি যে-সব কর্ম করছ, এ-সব সৎকর্ম। যদি ‘আমি কর্তা’ এই অহংকার ত্যাগ করে নিষ্কামভাবে করতে পার, তাহলে খুব ভাল। এই নিষ্কামকর্ম করতে করতে ঈশ্বরেতে ভক্তি ভালবাসা আসে। এইরূপ নিষ্কামকর্ম করতে করতে ঈশ্বরলাভ হয়।

“কিন্তু যত তাঁর উপর ভক্তি ভালবাসা আসবে, ততই তোমার কর্ম কমে যাবে। গৃহস্থের বউ, পেটে যখন ছেলে হয় -- শাশুড়ী তার কর্ম কমিয়ে দেয়। যতই মাস বাড়ে, শাশুড়ী কর্ম কমায়। দশমাস হলে আদপে কর্ম করতে দেয় না, পাছে ছেলের কোন হানি হয়, প্রসবের কোন ব্যাঘাত হয়। (হাস্য) তুমি যে-সব কর্ম করছ এতে তোমার নিজের উপকার। নিষ্কামভাবে কর্ম করতে পারলে চিত্তশুদ্ধি হবে, ঈশ্বরের উপর তোমার ভালবাসা আসবে। ভালবাসা এলেই তাঁকে লাভ করতে পারবে। জগতের উপকার মানুষ করে না, তিনিই করছেন, যিনি চন্দ্র-সূর্য করেছেন, যিনি মা-বাপের স্নেহ, যিনি মহতের ভিতর দয়া, যিনি সাধু-ভক্তের ভিতর ভক্তি দিয়েছেন। যে-লোক কামনাশূন্য হয়ে কর্ম করবে সে নিজেরই মঙ্গল করবে।”

[নিষ্কামকর্মের উদ্দেশ্য -- ঈশ্বরদর্শন ]

“অন্তরে সোনা আছে, এখনও খবর পাও নাই। একটু মাটি চাপা আছে। যদি একবার সন্ধান পাও, অন্য কাজ কমে যাবে। গৃহস্থের বউ-এর ছেলে হলে ছেলেটিকেই নিয়ে থাকে; ওইটিকে নিয়েই নাড়াচাড়া; আর সংসারের কাজ শাশুড়ী করতে দেয় না। (সকলের হাস্য)

“আরও এগিয়ে যাও। কাঠুরে কাঠ কাটতে গিছিল; -- ব্রহ্মচারী বললে, এগিয়ে যাও। এগিয়ে গিয়ে দেখে চন্দনগাছ। আবার কিছুদিন পরে ভাবলে, তিনি এগিয়ে যেতে বলেছিলেন, চন্দনগাছ পর্যন্ত তো যেতে বলেন নাই। এগিয়ে গিয়ে দেখে রূপার খনি। আবার কিছুদিন পরে এগিয়ে গিয়ে দেখে, সোনার খনি। তারপা কেবল হীরা, মাণিক। এই সব লয়ে একেবারে আণ্ডিল হয়ে গেল।

“নিষ্কামকর্ম করতে পারলে ঈশ্বরে ভালবাসা হয়; ক্রমে তাঁর কৃপায় তাঁকে পাওয়া যায়। ঈশ্বরকে দেখা যায়, তাঁর সঙ্গে কথা কওয়া যায়, যেমন আমি তোমার সঙ্গে কথা কচ্ছি!” (সকলে নিঃশব্দ)

Saturday, 7 May 2016

উপায় -- বিশ্বাস

যো মামজমনাদিঞ্চ বেত্তি লোকমহেশ্বরম্‌ ৷
অসংমূঢ়ঃ স মর্তেষু সর্বপাপৈঃ প্রমুচ্যতে ৷৷
                                                                    [গীতা -- ১০।৩]

উপায় -- বিশ্বাস
একজন ভক্ত -- মহাশয়, এরূপ সংসারী জীবের কি উপায় নাই?
শ্রীরামকৃষ্ণ -- অবশ্য উপায় আছে। মাঝে মাঝে সাধুসঙ্গ আর মাঝে মাঝে নির্জনে থেকে ঈশ্বরচিন্তা করতে হয়। আর বিচার করতে হয়। তাঁর কাছে প্রার্থনা করতে হয়, আমাকে ভক্তি বিশ্বাস দাও।
বিশ্বাস হয়ে গেলেই হল। বিশ্বাসের চেয়ে আর জিনিস নাই।
(কেদারের প্রতি) -- “বিশ্বাসের কত জোর তা তো শুনেছ? পুরাণে আছে, রামচন্দ্র যিনি সাক্ষাৎ পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণ, তাঁর লঙ্কায় যেতে সেতু বাঁধতে হল। কিন্তু হনুমান রামনামে বিশ্বাস করে লাফ দিয়ে সমুদ্রের পারে গিয়ে পড়ল। তার সেতুর দরকার হয় নাই। (সকলের হাস্য)
“বিভীষণ একটি পাতায় রামনাম লিখে ওই পাতাটি একটি লোকের কাপড়ের খোঁটে বেঁধে দিছল। সে লোকটি সমুদ্রের পারে যাবে। বিভীষণ তাকে বললে, ‘তোমার ভয় নাই, তুমি বিশ্বাস করে জলের উপর দিয়ে চলে যাও, কিন্তু দেখ যাই অবিশ্বাস করবে, অমনি জলে ডুবে যাবে।’ লোকটি বেশ সমুদ্রের উপর দিয়ে চলে যাচ্ছিল; এমন সময়ে তার ভারী ইচ্ছা হল যে, কাপড়ের খোঁটে কি বাঁধা আছে একবার দেখে! খুলে দেখে যে, কেবল ‘রামনাম’ লেখা রয়েছে! তখন সে ভাবলে, ‘এ কি! শুধু রামনাম একটি লেখা রয়েছে!’ যাই অবিশ্বাস, অমনি ডুবে গেল।
“যার ঈশ্বরে বিশ্বাস আছে, সে যদি মহাপাতক করে -- গো, ব্রাহ্মণ, স্ত্রী হত্যা করে, তবুও ভগবানে এই বিশ্বাসের বলে ভারী ভারী পাপ থেকে উদ্ধার হতে পারে। সে যদি বলে আর আমি এমন কাজ করব না, তার কিছুতেই ভয় হয় না।”

Thursday, 5 May 2016

খণ্ডন-ভব-বন্ধন.........


খণ্ডন-ভব-বন্ধন বা শ্রীরামকৃষ্ণ-আরাত্রিক ভজন হল হিন্দু সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দের লেখা একটি বাংলা গান।এই গানটি ঊনবিংশ শতাব্দীর হিন্দু ধর্মগুরু রামকৃষ্ণ পরমহংসের উদ্দেশ্যে রচিত। গানটির রচনাকাল ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দ।এটি মিশ্রকল্যাণ রাগ ও তালফেরতায় (চৌতাল, তিনতাল ও একতাল) রচিত একটি ভক্তিগীতি।
এই গানটিতে বিবেকানন্দ জাগতিক বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করার, এবং যাঁরা নিজেদের মুক্ত করতে পেরেছেন তাঁদের বিশ্বব্যাপী মুক্তি-চেতনা ছড়িয়ে দেবার ও বন্ধন ও দুঃখ থেকে মানুষকে মুক্ত হতে অনুপ্রেরিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

বিবেকানন্দ ছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংসের শিষ্য। রামকৃষ্ণ পরমহংসের শিক্ষা প্রসারিত করার উদ্দেশ্যে বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেটি হিন্দু সংস্কার আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে পরিণত হয়েছিল। বিবেকানন্দ ছিলেন পাশ্চাত্যে বেদান্ত ও যোগ দর্শনের প্রথম ও অন্যতম প্রধান প্রচারক। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ পর্যটন করে এই দুই দর্শন প্রচার করেছিলেন। ১৮৯৮ সালে রামকৃষ্ণ পরমহংসের শিষ্য নীলাম্বর বসুর বাড়িতে তিনি রামকৃষ্ণ মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। এই বাড়িতে অবস্থানকালেই তিনি এই গানটি রচনা করেছিলেন।

রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সব মন্দিরেই দৈনিক পূজার্চনার পর সন্ধ্যারতির সময় এই গানটি গাওয়া হয়৷

এই গানে বিবেকানন্দ দুঃখ ও জাগতিক বন্ধন থেকে ব্যক্তির মুক্তির কথা লিখেছেন। তিনি নিজেও তাঁর আধ্যাত্মিক জীবন এই কাজে অতিবাহিত খণ্ডন-ভব-বন্ধন বা শ্রীরামকৃষ্ণ-আরাত্রিক ভজন হল হিন্দু সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দের লেখা একটি বাংলা গান।এই গানটি ঊনবিংশ শতাব্দীর হিন্দু ধর্মগুরু রামকৃষ্ণ পরমহংসের উদ্দেশ্যে রচিত।গানটির রচনাকাল ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দ। এটি মিশ্রকল্যাণ রাগ ও তালফেরতায় (চৌতাল, তিনতাল ও একতাল) রচিত একটি ভক্তিগীতি।

এই গানটিতে বিবেকানন্দ জাগতিক বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করার, এবং যাঁরা নিজেদের মুক্ত করতে পেরেছেন তাঁদের বিশ্বব্যাপী মুক্তি-চেতনা ছড়িয়ে দেবার ও বন্ধন ও দুঃখ থেকে মানুষকে মুক্ত হতে অনুপ্রেরিত করার আহ্বান জানিয়েছেন ৷
এই স্তোত্রে বিবেকানন্দ তাঁর গুরু রামকৃষ্ণ পরমহংসকে সম্বোধন করে বন্দনা করেছেন। তিনি বলেছেন, তাঁর গুরু এমনই এক নিষ্কলুষ চরিত্র যিনি জগতের সকল বন্ধন খণ্ডন করতে সমক্ষ; তিনি মানুষের রূপধারী দিব্য জ্ঞানের প্রতিনিধি। গুরুর চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি অনুভব করেছেন, তাঁর চোখদুটি ঐশ্বরিক জ্ঞানের আলোকে উদ্ভাসিত এবং মায়াখণ্ডনকারী। মানুষকে মুক্ত করতে তিনি নিজে এই মানবদেহে বন্দী হয়ে এসেছেন। তাই তিনি তাঁর গুরুকে পুনরায় বন্দনা করেছেন। শেষে তিনি তাঁর গুরুকে "জ্যোতির জ্যোতি" বলে উল্লেখ করে তাঁর হৃদয়ের অন্ধকার ও অজ্ঞান দূর করার জন্য গুরুর কাছে প্রার্থনা করেছেন।








Monday, 2 May 2016

আমার ভিতরে যে আগুন জ্বলছে, তা তোমাদের ভিতর জ্বলে উঠুক........



নাম-যশ চুলোয় যাক ৷ কাজে লাগো, সাহসী যুবকবৃন্দ, কাজে লাগো ৷.... দূর করে দাও যত আলস্য, দূর করে দাও ইহলোক ও পরলোক ভোগের বাসনা ৷ আগুনে গিয়ে ঝাঁপ দাও ৷ আমার ভিতরে যে আগুন জ্বলছে, তা তোমাদের ভিতর জ্বলে উঠুক, তোমাদের মন-মুখ এক হোক -- ভাবের ঘরে চুরি যেন একদম না থাকে ৷ তোমরা যেন জগতের যুদ্ধক্ষেত্রে বীরের মতো মরতে পারো -- এটাই সবসময় বিবেকানন্দের প্রার্থনা ৷