যদি এই ব্রহ্মাণ্ড অনন্ত শক্তির বিকাশ হয়, তবে প্রলয়কালেও সেই অনন্ত শক্তি সঙ্কুচিতভাবে থাকিবে,ইহা স্বীকার করিতে হইবে ৷ অন্য কোন ভাব সম্ভব নয় ৷ অতএব ইহা নিশ্চিত যে,প্রত্যেক আত্মাই অনন্ত ৷ আমাদের পদতলসঞ্চারী ক্ষুদ্রতম কীট হইতে মহত্তম সাধু পর্যন্ত সকলেরই ভিতর অনন্ত শক্তি, অনন্ত পবিত্রতা ও সমুদয় গুণই অনন্ত পরিমাণে রহিয়াছে ৷ প্রভেদ কেবল প্রকাশের তারতম্যে ৷ কীটে সেই মহাশক্তির অতি অল্প পরিমাণ বিকাশ হইয়াছে, তোমাতে তাহা অপেক্ষা অধিক, আবার অপর একজন দেবতুল্য মানবে তাহা অপেক্ষা অধিকতর শক্তির বিকাশ হইয়াছে -- এইমাত্র প্রভেদ ৷ কিন্তু সকলের মধ্যেই সেই এক শক্তি রহিয়াছে ৷...... কেবল এই কপাট, দেহরূপ এই কপাট আমাদের যথার্থ ও পূর্ণ বিকাশ হইতে দিতেছে না ৷ আর যতই এই দেহের গঠন উন্নত হইতে থাকে,যতই তমোগুণ রজেগুণে এবং রজোগুণ সত্ত্বগুণে পরিণত হয়, ততই এই শক্তি ও শুদ্ধত্ব প্রকাশিত হইতে থাকে; এই জন্যই আমরা পানাহার সম্বন্ধে এত সাবধান ৷
বাণী ও রচনা, ৫ম খণ্ড, পৃ: ৩১২
এই জগতে আমরা যে-সকল জ্ঞানলাভ করি, তাহারা কোথা হইতে আসে? উহারা আমাদের ভিতরেই রহিয়াছে ৷ কোন জ্ঞান কি বাহিরে আছে? -- আমাকে এক বিন্দু দেখাও তো ৷ জ্ঞান কখনো জড়ে ছিল না, উহা বরাবর মানুষের ভিতরেই ছিল ৷ জ্ঞান কেহ কখনো সৃষ্টি করে নাই; মানুষ উহা আবিষ্কার করে, ভিতর হইতে উহাকে বাহির করে, উহা ভিতরেই রহিয়াছে ৷ এই যে ক্রোশব্যাপী বৃহৎ বটবৃক্ষ, তাহা ঐ সর্ষপবীজের অষ্টমাংশের তুল্য ক্ষুদ্র বীজে ছিল -- ঐ মহাশক্তিরাজি উহার ভিতরে নিহিত রহিয়াছে ৷ আমরা জানি, একটি জীবাণুকোষের ভিতর সকল শক্তি, প্রখর বুদ্ধি কুণ্ডলীকৃত হইয়া অবস্থান করে; তবে অনন্ত শক্তি কেন না তাহাতে থাকিতে পারিবে? আমরা জানি, তাহা আছে ৷..... আমাদের ভিতর শক্তি পূর্ব হইতেই অন্তর্নিহিত ছিল অব্যক্তভাবে, কিন্তু উহা ছিল নিশ্চয়ই ৷
বাণী ও রচনা, ২য় খণ্ড, পৃ: ২৭১-৭২

প্রেমকে আমরা একটি ত্রিকোণরূপে প্রকাশ করিতে পারি, উহার কোণগুলিই যেন উহার তিনটি অবিভাজ্য বৈশিষ্ট্যের প্রকাশক ৷ তিনটি কোণ ব্যতীত একটি ত্রিকোণ বা ত্রিভুজ সম্ভব নয় আর এই তিনটি লক্ষ্মণ ব্যতীত প্রকৃত প্রেমও সম্ভব নয় ৷ প্রেমরূপ এই ত্রিকোণের একটি কোণ : প্রেমে কোন দর-কষাকষি বা কেনাবেচার ভাব নাই ৷ যেখানে কোন প্রতিদানের আশা থাকে, সেখানে প্রকৃত প্রেম সম্ভব নয়; সে-ক্ষেত্রে উহা কেবল দোকানদারিতে পরিণত হয় ৷.... কোন বরলাভের জন্য, এমন কি মুক্তিলাভের জন্যও ভগবানের উপাসনা করা অধম উপাসনা! প্রেম কোন পুরস্কার চায় না, প্রেম সর্বদা প্রেমেরই জন্য ৷..... প্রেমরূপ ত্রিকোণের দ্বিতীয় কোণ : প্রেমে কোনরূপ ভয় নাই ৷ যাহারা ভগবানকে ভয়ে ভালবাসে,তাহারা মনুষ্যাধম; তাহাদের মনুষ্যভাব এখনও পূর্ণ বিকশিত হয় নাই ৷ তাহারা শাস্তির ভয়ে ভগবানকে উপাসনা করে ৷..... ভগবানকে দণ্ডের ভয়ে উপাসনা করা অতি নিম্নশ্রেণীর উপাসনা ৷..... প্রেম স্বভাবতই সমুদয় ভয়কে জয় করিয়া ফেলে ৷...... প্রেমরূপ ত্রিকোণের তৃতীয় কোণ : প্রেমে প্রতিদ্বন্দ্বীর স্থান নাই ৷ প্রেমিকের আর দ্বিতীয় ভালবাসার পাত্র থাকিবে না, কারণ প্রেমেই প্রেমিকের সর্বোচ্চ আদর্শ রূপায়িত ৷ যতদিন না ভালবাসার পাত্র আমাদের সর্বোচ্চ আদর্শ হইয়া দাঁড়ায়, ততদিন প্রকৃত প্রেম সম্ভব নয় ৷
বাণী ও রচনা, ৪র্থ খণ্ড, (ভক্তিযোগ)

ভারত পুণ্যভূমি, কর্মভূমি ৷.... যদি এই পৃথিবীর মধ্যে এমন কোন দেশ থাকে,যাহাকে 'পুণ্যভূমি' নামে বিশেষিত করা যাইতে পারে -- যদি এমন কোন স্থান থাকে যেখানে পৃথিবীর সকল জীবকেই তাহার কর্মফল ভুগিতে আসিতে হইবে -- যেখানে ঈশ্বরের অভিমুখী জীবমাত্রকেই পরিণামে আসিতে হইবে -- যেখানে মনুষ্যজাতির ভিতর সর্বাপেক্ষা অধিক ক্ষমা, দয়া, পবিত্রতা, শান্তভাব প্রভৃতি সদ্ গুণের বিকাশ হইয়াছে -- যদি এমন কোন দেশ থাকে, যেখানে সর্বাপেক্ষা অধিক আধ্যাত্মিকতা ও অন্তর্দৃষ্টির বিকাশ হইয়াছে, তবে নিশ্চয় বলিতে পারি, তাহা আমাদের মাতৃভূমি -- এই ভারতবর্ষ ৷ অতি প্রাচীনকাল হইতেই এখানে বিভিন্ন ধর্মের সংস্থাপকগণ আবির্ভূত হইয়া সমগ্র পৃথিবীকে বারংবার সনাতন ধর্মের পবিত্র আধ্যাত্মিক বন্যায় ভাসাইয়া দিয়াছেন ৷ এখান হইতেই উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম -- সর্বত্র দার্শনিক জ্ঞানের প্রবল তরঙ্গ বিস্তৃত হইয়াছে ৷ আবার এখান হইতে তরঙ্গ উত্থিত হইয়া পৃথিবীর জড়বাদী সভ্যতাকে আধ্যাত্মিকতায় পূর্ণ করিবে ৷ অন্যান্য দেশের লক্ষ লক্ষ নরনারীর হৃদয়দগ্ধকারী জড়বাদরূপ অনল নির্বান করিতে যে জীবনপ্রদ বারির প্রয়োজন, তাহা এখানেই রহিয়াছে ৷ বন্ধুগণ, বিশ্বাস করুন ভারতই আবার পৃথিবীকে আধ্যাত্মিক তরঙ্গে প্লাবিত করিবে ৷
বাণী ও রচনা, ৫ম খণ্ড, (ভারতে বিবেকানন্দ )
যে-কোন উপদেশ দুর্বলতা শিক্ষা দেয়, তাহাতে আমার বিশেষ আপত্তি; নর-নারী, বালক - বালিকা যখন দৈহিক মানসিক বা আধ্যাত্মিক শিক্ষা পাইতেছে, আমি তাহাদিগকে এই এক প্রশ্ন করিয়া থাকি -- তোমরা কি বল পাইতেছ? কারণ আমি জানি, একমাত্র সত্যই বল বা শক্তি প্রদান করে ৷ আমি জানি, সত্যই একমাত্র প্রাণপ্রদ, সত্যের দিকে না গেলে আমরা কিছুতেই বীর্যবান হইব না, আর বীর না হইলে সত্যেও যাওয়া যাইবে না ৷ এইজন্যই যে-কোন মত, যে-কোন শিক্ষাপ্রণালী মনকে ও মস্তিষ্ককে দুর্বল করিয়া ফেলে, মানুষকে কুসংস্কারাবিষ্ট করিয়া তোলে, যাহাতে মানুষ অন্ধকারে হাতড়াইয়া বেড়ায়, যাহা সর্বদাই মানুষকে সকলপ্রকার বিকৃতমস্তিষ্কপ্রসূত অসম্ভব আজগুবী ও কুসংস্কারপূর্ণ বিষয়ের অন্বেষণ করায় -- আমি সেই প্রণালীগুলি পছন্দ করি না, কারণ মানুষের উপর তাহাদের প্রভাব বড় ভয়ানক, আর সেগুলিতে কিছুই উপকার হয় না, সেগুলি নিতান্ত নিষ্ফল ৷
বাণী ও রচনা, ২য় খণ্ড, পৃ: ২১৬ (জ্ঞানযোগ)
My boy, when death is inevitable, is it not better to die like heroes than as stocks and stones? And what is the use of living a day or two more in this transitory world? It is better to wear out than to rust out --- specially for the sake of doing the least good to others.
চেতনা - অন্তঃকরণবৃত্তি, জ্ঞানাত্মিকা মনোবৃত্তি ৷ চেতনা স্থূলে নামরূপ আকারে পরিব্যক্ত; সূক্ষ্মে প্রাণশক্তিরূপে এবং কারণে অব্যক্ত বীজরূপে অবস্থিত মা চৈতন্যরূপিণী ৷
'সারদে জ্ঞানদায়িকে ৷' শ্রীমা ছিলেন প্রজ্ঞা ও বিদ্যারূপিণী এবং জ্ঞানদায়িনী ৷ তিনি বহু নরনারীকে দীক্ষা ও উপদেশের দ্বারা তাদের অন্তর্নিহিত চৈতন্যকে জাগিয়ে দিয়েছেন ৷ শাস্ত্র বলেন, 'জ্ঞানাদেব মুক্তিঃ' (জ্ঞানেই মুক্তি )৷ মা বলেছেন : ''বাসনাই সকল দুঃখের মূল, বার বার জন্মমৃত্যুর কারণ, আর মুক্তিপথের অন্তরায় ৷..... নির্বাসনা যদি হতে পার, এক্ষুনি (তত্ত্বজ্ঞান) হয় ৷''
মা অন্তরঙ্গদের আশীর্বাদ করতেন, ''জ্ঞান চৈতন্য হোক ৷'' কোনও সন্তানদের বক্ষঃস্থল ও মস্তকে জপ করে দিতেন; দু একস্থলে পৃষ্ঠদেশে হাত বুলিয়ে 'কুণ্ডলিনী জাগুক' বলে আশীর্বাদ করতেন ৷